প্রভুভক্ত প্রাণী হিসেবে কুকুরের জুড়ি নেই। প্রাচীনকাল থেকেই কুকুর মানুষের সহচর্যে থেকে শিকার কার্যে সহায়তা করেছে এবং সহজেই পোষ মেনে গিয়েছে। প্রভুভক্ত এই প্রাণীটির বহু প্রজাতি পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কোথাও কোথাও কুকুরের একটা প্রজাতির পিওর ব্রিড, কোথাও বা মিক্স ব্রিড বেশি দেখতে পাওয়া যায়। আজ কথা বলবো বিখ্যাত দুইটি বন্ধুসুলভ কুকুর এর জাত ল্যাব্রাডর রিট্রিভার ও জার্মান শেফার্ড নিয়ে।
ল্যাব্রাডর রিট্রিভার:
এটি মূলত যুক্তরাজ্যের কুকুরের একটি প্রজাতি যারা “রেট্রিভার গান ডগ” হিসেবে সুপরিচিত। পশ্চিমা বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এই কুকুরটিকে প্রায়শই বিভিন্ন অভিজাত বাড়ির লনে দেখতে পাওয়া যায়। তবে অভিজাত শ্রেণির মানুষরা ছাড়াও যারা পশুপ্রেমী এবং বেশ শৌখিন, তারা এই প্রজাতির বন্ধুসুলভ কুকুর পুষে থাকেন।
এদের পুরুষ প্রজাতি ২২-২২.৫ ইঞ্চি এবং নারী প্রজাতি ২১.৫-২২ ইঞ্চি হয়ে থাকে। পুরুষ প্রজাতির ওজন ৬৫-৮০ পাউন্ড এবং নারী প্রজাতির ওজন ৫৫-৭০ পাউন্ড হয়ো থাকে। এরা কালো, চকোলেট এবং সাদা রং এর হয়ে থাকে।
ল্যাব্রাডর জাতটি কমপক্ষে ১৮৩০ এর দশকের। নিউফাউন্ডল্যান্ডে বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা সেন্ট জনস ওয়াটার কুকুরগুলিকে প্রথম ব্রিটেনের সাথে কানাডা এবং ডরসেটায়ারের পুলের মধ্যে জাহাজের ব্যবসার মধ্য দিয়ে পরিচয় করিয়েছিলেন। এরপরে ব্রিটিশ শিকার কুকুরের সাথে প্রজনন করা হয়েছিল যা মূলত বর্তমান ল্যাব্রাডর রিট্রিভার হিসাবে পরিচিত।
ব্রিডের প্রথম ছবি তোলা হয়েছিল ১৮৫৬ সালে যা বর্তমানে ইন্টারনেটে পাওয়া যাবে। ১৮৭০ সালের মধ্যে “ল্যাব্রাডর রিট্রিভার” নামটি ইংল্যান্ডে প্রচলিত হয়ে ওঠে এবং সবাই বন্ধুসুলভ কুকুরটিকে এই নামেই ডাকতে থাকে।
সাধারণভাবে ল্যাব্রাডাররা মাঝারি আকারের কুকুর হিসাবে জন্মগ্রহণ করেন, তাদের মুখের তুলনায় খাটো এবং স্টকায়ার এবং তাদের ফিল্ডের অংশগুলির তুলনায় কিছুটা শান্ত প্রকৃতির। এরা প্রায়শই লম্বা, হালকা গড়নের ও বেশ পরিচ্ছন্ন কুকুর। কিছুটা কম প্রশস্ত মুখযুক্ত এবং কিছুটা দীর্ঘ নাকযুক্ত অবয়ব এদের আকর্ষণীয় করে তুলে।
ল্যাব্রাডরের চুল সাধারণত ছোট এবং সোজা হয় এবং লেজটি বেশ প্রশস্ত এবং শক্ত হয়। ল্যাব্রাডরের বিশেষ গড়ণের পায়ের আঙ্গুলগুলি তাদের দুর্দান্ত সাঁতারু করে তোলে।তাদের পায়ের আঙ্গুলের মাঝে বোলিং থাকে যা তুষারকে ধরে রাখতে পারে এবং আঙ্গুলের ফাঁকের কম পুরু চামড়াকে শীত কালে ফেঁটে যাওয়া হতে রক্ষা করে। তাদের “ইন্টার ওয়োভেন কোট” নামক আবরণ তুলনামূলকভাবে জলরোধী এবং সাঁতারের জন্য বেশ সহযোগীতা করে।
খাদ্য:
পর্যাপ্ত পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট, চর্বি, খনিজ এবং ভিটামিনযুক্ত খাদ্য সরবরাহের সময় আপনার প্রিয় ল্যাবরাটরটির জন্য প্রোটিনের পরিমাণ বেশি হওয়া উচিত। আপনি যদি বাসায় তৈরী করা খাবার খাওয়ান, তবে নিশ্চিত করুন যে আপনার কুকুরটি ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের সাথে ৩০ শতাংশ চর্বিযুক্ত মাংস পায়। ল্যাব্রাডরের কঙ্কাল সিস্টেম শক্তিশালী করতে খাদ্যে প্রায় ২ শতাংশ ক্যালসিয়াম থাকা উচিত। নাহলে হাড্ডির গঠন অপরিপক্ক হবে এবং ভবিষ্যতে নানাবিধ সমস্যা সংঘটিত হতে পারে।
যদি আপনার কুকুরের দাঁতে অথবা মাড়িতে কোন সমস্যা থাকে তবে তাকে হাড় খেতে দিবেন না। হাড় থেকে বিভিন্ন মাড়ি এবং দাঁতের অসুখ হতে পারে। বেশি হাড় খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে এবং হাড়টি বড় হতে হবে যাতে পুরো হাড়টি মুখে না ঢুকাতে পারে।
সেদ্ধ করা মাংসের সাথে (মশলা, পেয়াজ, রসুন ছাড়া) ভাত অথবা পাস্তা মিশিয়ে কুকুরকে খাওয়ানো যায়।মাঝে মাঝে অল্প পরিমানে সেদ্ধ করা সবজি যেমনঃ মিষ্টিকুমড়া, গাজর, ব্রকলি ইত্যাদি খাওয়ানো যায়। মাঝে মধ্যে treat হিসেবে বিভিন্ন canned মাছ যেমনঃ sardines, tuna, salmon ইত্যাদি খাওয়ানো যায়।
আরও পড়ুনঃ
’থ্যাংস গিভিং ডে’ উপলক্ষে একটি টার্কিকে মুক্তি দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
পাঁচটি ‘বিষাক্ত ফুল’ যা হতে পারে মৃত্যুর কারণ
দেশীয় মাছ: বিলুপ্তির পথে দেশীয় প্রজাতির মাছগুলি
অনেকেই সুপার শপ থেকে কেনা ক্যানড খাবার খাওয়ানোর ব্যপারে বেশি আগ্রহী থাকে।ক্যানড খাবার কখনোই কুকুর কিংবা বিড়াল কোনোটিকেই সর্বাবস্থায় খাওয়ানো উচিৎ নয়।শুধুমাত্র ইমার্জেন্সি সময়ে ক্যানড খাবার সরবরাহ করুন এবং অধিকাংশ সময় ঘরে তৈরী পুষ্টিযুক্ত খাবার সরবরাহ করুন।
পূর্ণ বয়স্ক কুকুরকে প্রতিদিন দুইবার খাওয়াতে হবে। খাওয়ার ঠিক আগে এবং ঠিক পরে ব্যায়াম ও হাঁটা উচিৎ নয়।কুকুরকে যা খাওয়ানো উচিৎ নয় (কুকুরের জন্য বিষাক্ত) এমন কিছু খাবার হলো- পিঁয়াজ, রসুন, চকলেট, কফি ও ক্যফেইন, এভাকাডো ফল, কাঁচা আটা, ইস্ট, আঙ্গুর, কিশমিশ, বাদাম, ফলের বিচি বা দানা যেমন-আমের আটি, এভাকাডো ফলের দানা, কাঁচা টমেটো, মাশরুম, প্রতিদিন মাছ, ছোট হাড়, Xylitol (বিভিন্ন খাবারে চিনির বদলে ব্যবহৃত হয়), চুইঙ্গাম, টুথপেস্ট ইত্যাদি।
জার্মান শেফার্ড:
জার্মান শেফার্ড একটি মাঝারি থেকে বড় আকারের পরিশ্রমী কুকুরের একটি জাত যা জার্মানিতে উদ্ভূত হয়েছিল। এফসিআই অনুসারে, জাতটির ইংরেজি ভাষার নাম জার্মান শেফার্ড কুকুর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত নামটি জার্মান শেফার্ডে নামকরণ করা হলেও ব্রিটেনে আনুষ্ঠানিকভাবে “আলসতিয়ান ওল্ফ কুকুর” নামে পরিচিত ছিল।
এর জীবনকাল সাধারণত ৯-১৩ বছর। এরা ৪৮ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা গতিতে দৌড়াতে সক্ষম।এদের পুরুষ প্রজাতির উচ্চতা ২৪-২৬ ইঞ্চি এবং মহিলা প্রজাতির উচ্চতা ২২-২৪ ইঞ্চি হয়ে থাকে। এর পুরুষ প্রজাতি ৬৬-৮৮ পাউন্ড এবং মহিলা প্রজাতি ৪৯-৭১ পাউন্ড হয়ে থাকে।
পোষা কুকুর হিসাবে জার্মান শেফার্ড মেষ পালনের জন্য মূলত পালন করা হতো। সেই সময় থেকে তাদের শক্তি, বুদ্ধিমত্তা, প্রশিক্ষণ এবং আনুগত্যের কারণে বিশ্বজুড়ে জার্মান রাখালরা প্রায়শই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কাজ, পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীতে ভূমিকা এবং অভিনয় সহ বিভিন্ন ধরণের কাজের জন্য পছন্দসই জাত হলো এই জার্মান শেফার্ড।
জার্মান শেফার্ডদের তাদের বুদ্ধিমত্তার জন্যও বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হতো। তাদের শক্তির সাথে মিলিত হয়ে এই বৈশিষ্ট্যটি তাদের পুলিশ, প্রহরী এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার কুকুর হিসাবে আকাঙ্ক্ষিত করে তোলে। তারা দ্রুত বিভিন্ন কাজ শিখতে এবং অন্যান্য জাতের চেয়ে নির্দেশাবলীর আরও ভাল ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়। এছাড়া, ঘ্রাণ শক্তিতেও এরা যথেষ্ট এগিয়ে অন্যান্য প্রজাতির থেকে।
খাদ্য:
জার্মান শেফার্ড কুকুরও আমিষপ্রিয়। প্রাণীজ কিংবা উদ্ভিজ্জ উভয় ধরণের আমিষের প্রতি তাদের অনুরাগ রয়েছে। এদের স্নেহ জাতীয় পদার্থ সরবারহের জন্য চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়াতে পারেন।
খাওয়ার সাথে সম্পর্কিত আগ্রাসন এড়িয়ে চলুন। খাওয়ার সময় আপনি কুকুরটিকে পোষ মানাতে পারেন যতক্ষণ না এটি উত্তেজনা না পায় বা খাওয়া বন্ধ করে দেয় না। যদি এটি ঘটে বা এটি বাড়তে শুরু করে, আপনার অবশ্যই এই আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়াটি সঙ্গে সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
সেদ্ধ করা মাংস ছাড়াও মাঝে মধ্যে সব্জি খাওয়াতে পারেন এবং ক্যানড ফুড খাওয়ানোর অভ্যাসও গঠন করতে হবে।
যেখানে কিনতে পাবেন:
বাংলাদেশে এই দুই প্রজাতির বন্ধুসুলভ কুকুর এর বেশ দাম এবং খুব কম মানুষই এটা পালন করেন। রাজধানীর কাটাবনে কয়েকটা পেট শপে আপনি জার্মান শেফার্ড পেয়ে যাবেন। এর মধ্যে সবচয়ে পুরাতন শপের নাম হলো “এস এন পেট শপ“। জার্মান শেফার্ডের প্রতিটির দাম পড়বে আনুমানিক ১৫-২০ হাজার টাকা। আর ইংল্যান্ডের ল্যাব্রাডর প্রজাতির কুকুরের দাম পড়বে ২০-২৭ হাজার টাকা।
উল্লেখ্য যে, বন্ধুসুলভ কুকুর গুলো যেহেতু বাইরে থেকে আনা হয়, তাই সরবরাহের উপর ভিত্তি করে দাম উঠা নামা করতে পারে।
ছবিঃ সংগৃহীত
তথ্য সহায়তা: www.pet.com.bd, Wikipedia
ল্যাব্রাডর এবং জার্মান শেপার্ড অত্যান্ত দামী প্রজাতির কুকুর। এদের সবাই পোষা হিসাবে ব্যবহার করে না। বরং বিত্তশালীরাই এদের পোষ মানিয়ে থাকে। এদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।