স্বাস্থ্য শুধুমাত্র রোগ থেকে মুক্তি বা নীরোগ দেহ বা শারীরিক সুস্থতা নয়, স্বাস্থ্য হল ব্যক্তির সামাজিক, মানসিক ও শারীরিক গুণাবলির এমন একটি সমন্বয়, যা তাকে পরিপূর্ণ জীবন যাপনে সহায়তা করে – বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। স্বাস্থ্য মানুষের জীবনের সবথেকে বড় সম্পদ। আমরা সবাই সুস্থ ও নীরোগ থাকতে চাই । তাই আমাদের খাদ্য, পানীয়, আলো-বাতাস, স্নান, পোশাক, সুনিদ্রা, বিশ্রাম ইত্যাদির দিকে খেয়াল রাখা দরকার ।
এখন আমরা জানব যে আমাদের সুস্থ ও নীরোগ থাকার উপায় গুলি কি কি? সব সময় এগুলি মেনে চলার চেষ্টা করবো, ফলে আমরা পাবো সুস্থ, নীরোগ, সুন্দর এই পৃথিবীতে বাঁচার জন্য দীর্ঘ জীবন।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন:
সুস্থ ও নীরোগ থাকার প্রধান উপায় হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। মেয়ো ক্লিনিকের মতে, অসুস্থতা এবং রোগ সংক্রমণ এড়ানোর সবচেয়ে ভালো একটা উপায় হল হাত ধোয়া। সর্দিকাশি হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, হাতে জীবাণু থাকা অবস্থায় নাক বা চোখ ঘষা। এই ধরনের জীবাণুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হল, নিয়মিতভাবে হাত ধোয়া।
উত্তম স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে বিভিন্ন মারাত্মক রোগের সংক্রমণও এড়ানো যায়। যেমনঃ নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া। এই ধরনের রোগের কারণে প্রতি বছর কুড়ি লক্ষেরও বেশি শিশু মারা যায়, যাদের বয়স পাঁচ বছরের নীচে। হাত ধোয়ার মতো সাধারণ অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে এমনকী মারাত্মক ইবোলা ভাইরাস ও করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হার কমানো যেতে পারে।
বিশেষভাবে নির্দিষ্ট কিছু সময়ে হাত ধোয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আপনি নিজেকে ও অন্যদের সুস্থ রাখতে পারেন। মূলত এই সময়গুলোতে হাত ধোয়া উচিত:
- টয়লেট ব্যবহার করার পরে।
- বাচ্চাদের ডায়াপার বদলানোর পর অথবা তাদের টয়লেট করানোর পরে।
- ক্ষতস্থান অথবা কাটা জায়গা পরিষ্কার করে ওষুধ লাগানোর আগে এবং পরে।
- কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়ার আগে এবং পরে।
- খাবার প্রস্তুত করার, তা পরিবেশন করার অথবা খাওয়ার আগে।
- হাঁচি দেওয়ার, কাশি দেওয়ার এবং নাক ঝাড়ার পরে।
- কোনো পশুর গায়ে হাত দেওয়ার অথবা তাদের মল-মূত্র পরিষ্কার করার পরে।
- আবর্জনা পরিষ্কার করার পরে।
আর সঠিকভাবে হাত ধোয়ার বিষয়টাকে হালকাভাবে নেবেন না। গবেষণা করে দেখা গিয়েছে, পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করে এমন ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশই পরে হাত ধোয় না অথবা ধুলেও, সঠিকভাবে ধোয় না। কীভাবে হাত ধোয়া উচিত?
- পরিষ্কার জলের নীচে হাত ভেজান এবং সাবান লাগান।
- দু-হাত ঘষে ফেনা তৈরি করুন ও সেইসঙ্গে অবশ্যই নখ, বৃদ্ধাঙ্গুল, হাতের পিছন দিক এবং আঙুলের মাঝের জায়গা পরিষ্কার করুন।
- অন্ততপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ঘষুন।
- পরিষ্কার জলের নীচে হাত ধোন।
- কোনো পরিষ্কার তোয়ালে দিয়ে হাত মুছুন।
যদিও এই বিষয়গুলো খুবই সাধারণ কিন্তু এগুলো অসুস্থতার হাত থেকে রক্ষা করার এবং জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী।
বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করুন:
কিছু কিছু দেশে পরিবারের জন্য বিশুদ্ধ জল সরবরাহ করা রোজকার বিষয়। কিন্তু, পৃথিবীর যেকোনো জায়গায়ই বিশুদ্ধ জল পাওয়া সেই সময় কঠিন হয়ে উঠতে পারে, যখন বন্যা, ঝড়, পাইপ ভেঙে যাওয়া অথবা অন্যান্য কারণে জলের প্রধান উৎস দূষিত হয়ে পড়ে।
জলের উৎস যদি নিরাপদ না হয় এবং জল সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে রাখা না হয়, তা হলে এতে রোগজীবাণু জন্মাতে পারে ও সেইসঙ্গে কলেরা, প্রাণনাশক ডায়েরিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগ হতে পারে। একটা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর ১৭০ কোটি লোক ডায়েরিয়ায় আক্রান্ত হয় আর এর একটা প্রধান কারণ হল, দূষিত জল পান করা।
সহজেই অসুস্থ না হওয়ার অথবা সুস্থ থাকার উপায় বের করার জন্য আপনি অনেক কিছু করতে পারেন।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অসুস্থ ব্যক্তির মলের দ্বারা দূষিত জল ও খাবার খাওয়ার কারণে কলেরা হয়ে থাকে। এই ধরনের এবং অন্যান্য জল দূষণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা ও সুস্থ থাকার উপায় বের করার জন্য আপনি পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন, এমনকী তা যদি কোনো দুর্যোগের ঠিক পরেও হয়ে থাকে?
লক্ষ রাখুন যাতে পানীয় জল ও সেইসঙ্গে দাঁত ব্রাশ করার, আইস কিউব তৈরি করার, খাবার ও বাসনপত্র ধোয়ার অথবা রান্না করার জল নিরাপদ উৎস থেকে আসে; সেই উৎস হতে পারে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য সরবরাহকৃত ভালোভাবে পরিশোধিত জল অথবা নির্ভরযোগ্য কোম্পানির দ্বারা সরবরাহকৃত সিল করা বোতল।
কোনোভাবে যদি পাইপের জল দূষিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তা হলে সেই জল ব্যবহার করার আগে ফুটিয়ে নিন অথবা উপযুক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করে জল পরিশোধন করে নিন।
বিভিন্ন কেমিক্যাল যেমন, ক্লোরিন অথবা জল পরিশোধক ট্যাবলেট ব্যবহার করার সময় প্রস্তুতকারী সংস্থার নির্দেশনা ভালোভাবে পড়ে তা অনুসরণ করুন।
গুণগত মানসম্পন্ন জলের ফিলটার ব্যবহার করুন, যদি তা সহজেই পাওয়া যায় এবং কেনার সামর্থ্য থাকে।
এমনকী জল পরিশোধন করার কেমিক্যালও যদি পাওয়া না যায়, তা হলে ঘরে ব্যবহারযোগ্য ব্লিচ ব্যবহার করুন, ১ লিটার জলে দু-ফোঁটা (১ গ্যালন জলে আট ফোঁটা) ব্লিচ ভালোভাবে মিশিয়ে ৩০ মিনিট রেখে দিন এবং এরপর ব্যবহার করুন।
পরিশোধিত জল সবসময় পরিষ্কার পাত্রে ঢেকে রাখুন, যাতে তা আবারও দূষিত হয়ে না যায়।
লক্ষ রাখুন যাতে জল তোলার পাত্র পরিষ্কার থাকে।
পরিষ্কার হাতে জলের পাত্র ব্যবহার করুন এবং জল তোলার সময় হাত ও আঙুল জলের মধ্যে ডোবাবেন না।
খাবারের প্রতি খেয়াল রাখুন:
খাদ্য হল আমাদের শরীরের প্রধান শক্তির উৎস। আমাদের বয়স ও শরীরের ক্ষমতা অনুসারে সহজপাচ্য, পুষ্টিকর, লঘু খাদ্য গ্রহণ করা দরকার। শিশুদের ও বয়স্কদের পরিমাণ অনুসারে খাবার খাওয়া উচিত। কারন পরিমিত পরিমানে খাবার গ্রহন সুস্থ থাকার অন্যতম একটি উপায় বা মাধ্যম। আমরা যে সমস্ত খাবার খাই-
ক) প্রোটিন – শরীরের তাপ উৎপাদন, ক্ষয়পুরন, শরীরের উপাদান নির্মাণ করে। সিম, ডাল, কাঁঠাল, বাদাম, তিল, মাশরুম প্রভৃতি থেকে প্রোটিন পাই।
খ) ফ্যাট বা চর্বি জাতীয় – শরীরে মেদ বা চর্বি তৈরি করে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ঘি, ছানা, ইত্যাদি থেকে ফ্যাট পাওয়া যায়।
গ) কার্বোহাইড্রেট – শরীরের কাজ করার ক্ষমতা, তাপ উৎপাদন, দেহে তেজ তৈরি করে। আলু, ভুট্টা, গম, আপেল, মসুর, আখ, মধু, ডিমেতে পাওয়া যায়।
ঘ) ভিটামিন – ভিটামিনের আরেক নাম খাদ্যপ্রাণ। এর ওভাবে শরীর দুর্বল হয়ে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে যায়। বিভিন্ন রোগ আক্রমণ করে। ভিটামিন পাওয়া যায় আম, গাজর, ডাল, সবুজ শাকসবজি, সয়াবিন, কলা, দৈ, মাখন, ডিম, মাংসতে।
ঙ) লবণ – লবণ আমাদের দেহের জন্য দরকারি উপাদান। আমরা শাকসবজি, ফলমূল এবং আরও নানা খাবার থেকে লবণ পাই। আমাদের এই খাবার গুলি খেতে হবে।
পুষ্টি ছাড়া ভালো স্বাস্থ্য সম্ভব নয় আর পুষ্টি লাভ করার জন্য স্বাস্থ্যকর, সুষম খাবার প্রয়োজন। আপনার খাদ্য তালিকার মধ্যে লবণ, চর্বি ও শর্করাযুক্ত খাবার থাকতে হবে, তবে লক্ষ রাখবেন যেন তা অতিরিক্ত হয়ে না যায়।
এই তালিকার মধ্যে যেন ফলমূল ও শাকসবজিও থাকে আর খাবারে যেন বৈচিত্র্য থাকে। পাউরুটি, সিরিয়াল, পাস্তা অথবা চাল কেনার সময় প্যাকেটের গায়ে লেখা উপকরণের তালিকা দেখে নিন, যাতে আপনি ভুসিযুক্ত খাবার বেছে নিতে পারেন।
ভুসি ছাড়ানো শস্য থেকে তৈরি খাবারের বিপরীতে এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি ও ফাইবার থাকে। প্রোটিন পাওয়ার জন্য অল্প পরিমাণ এবং কম চর্বিযুক্ত মাংস খান আর সপ্তাহে অন্ততপক্ষে কয়েক বার মাছ খাওয়ার চেষ্টা করুন। কিছু দেশে উদ্ভিদ থেকে প্রস্তুত এমন প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার পাওয়া যায়।
আপনি যদি শর্করা-জাতীয় খাবার এবং প্রচুর চর্বি রয়েছে এমন খাবার খুব বেশি খান, তা হলে আপনি অতিরিক্ত ওজন বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকির মুখে রয়েছেন।
এই ঝুঁকি কমানোর জন্য প্রচুর পরিমাণে শর্করা রয়েছে। শর্করা-জাতীয় ডেজার্টের পরিবর্তে বেশি করে ফল খান। যে-খাবারগুলোতে প্রচুর চর্বি রয়েছে সেগুলো কম খান, যেমন সসেজ, মাংস, মাখন, কেক, চিজ ও কুকিজ। আর রান্নার জন্য মাখন অথবা ঘি ব্যবহার করার পরিবর্তে, স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো এমন তেল ব্যবহার করুন।
আরও পড়ুনঃ
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অবসাদ হতে পারে শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ!
কিডনির সুস্থতা -কিডনি সুস্থ রাখতে যা যা করণীয়
মধু -স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মধুর ১০টি উপকারিতা
আপনার খাদ্য তালিকার মধ্যে যদি এমন খাবার থাকে, যেগুলোতে অতিরিক্ত লবণ বা সোডিয়াম রয়েছে, তা হলে সেটা আপনার রক্তচাপ মাত্রাতিরিক্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।
আপনার যদি এই সমস্যা থেকে থাকে, তা হলে সোডিয়ামের মাত্রা কমানোর জন্য প্যাকেটজাত খাবারের গায়ে উপকরণের তালিকা দেখে নিন। স্বাদ বৃদ্ধির জন্য লবণের পরিবর্তে বিভিন্ন পাতা বা মশলা ব্যবহার করুন।
পুষ্টির সঙ্গে ফুড পয়জনিংয়ের বিষয়টাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেকোনো খাবারেই আপনার ফুড পয়জনিং হতে পারে, যদি তা ভালোভাবে তৈরি করা ও সংরক্ষণ করা না হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) রিপোর্ট অনুসারে এইরকম খাবার খাওয়ার কারণে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ লোক অসুস্থ হয়।
যদিও অনেকে এগুলোর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়, কিন্তু এগুলোর ফলে কেউ কেউ তাদের প্রাণ হারায়। এই ঝুঁকি কমানোর জন্য আপনি কী করতে পারেন?
শাকসবজিতে হয়তো সার দেওয়া থাকতে পারে, তাই সেগুলো ব্যবহার করার আগে ভালো করে ধুয়ে নিন।
প্রতিটা খাবার তৈরি করার আগে আপনার হাত, কাটিং বোর্ড, কাটার যন্ত্রপাতি, বাসনপত্র এবং রান্নাঘরের উপরিভাগের মেঝে গরম জল ও সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন।
খাবার যাতে আবারও দূষিত না হয়ে পড়ে, তাই কখনোই এমন কোনো জায়গায় অথবা পাত্রে খাবার রাখবেন না, যেখানে আগে কাঁচা ডিম, মাংস অথবা মাছ রাখা হয়েছিল। এইরকম কোনো জায়গা বা পাত্র ব্যবহার করার আগে তা ধুয়ে নিন।
সঠিক তাপমাত্রায় না পৌঁছানো পর্যন্ত খাবার রান্না করুন এবং সহজেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে, এমন যেকোনো খাবার সঙ্গেসঙ্গে না খেলে তাড়াতাড়ি তা ফ্রিজে রাখুন।
ঘরের তাপমাত্রা যদি ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে থাকে, তা হলে সেখানে সহজেই নষ্ট হয়ে যায় এমন খাবার এক বা দু-ঘন্টার বেশি সময় থাকলে, সেটা ফেলে দিন।
শারীরিক পরিশ্রম করুন:
আপনার বয়স যা-ই হোক না কেন, সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিতভাবে শারীরিক পরিশ্রম করা প্রয়োজন। আজকাল লোকে যথেষ্ট ব্যায়াম করে না। ব্যায়াম করা কেন গুরুত্বপূর্ণ? শারীরিক পরিশ্রম করা আপনাকে এই বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে সাহায্য করবে:
- ভালোভাবে ঘুমাতে পারবেন।
- সচল থাকবেন।
- মজবুত হাড় এবং শক্তিশালী পেশি গড়ে তুলতে পারবেন।
- ওজন ঠিক রাখতে অথবা ওজন সঠিক মাত্রায় নিয়ে আসতে পারবেন।
- বিষণ্ণতা রোগের ঝুঁকি কমাতে পারবেন।
- অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে পারবেন।
আপনি যদি শারীরিক পরিশ্রম না করেন, তা হলে আপনার হয়তো এই বিষয়গুলো হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে:
- হার্টের রোগ।
- টাইপ ২ ডায়াবেটিস।
- উচ্চ রক্তচাপ।
- হাই কোলেস্টেরল।
- স্ট্রোক।
কোন ধরনের শরীরচর্চা আপনার জন্য উপযুক্ত, সেটা যেহেতু আপনার বয়স এবং স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করে, তাই কোনো নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া বিজ্ঞতার কাজ।
বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতে, ছোটো ছেলে-মেয়ে এবং কিশোর-কিশোরীদের প্রতিদিন অন্ততপক্ষে ৬০ মিনিট হালকা থেকে শুরু করে ভারী ব্যায়াম করা উচিত। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতি সপ্তাহে ১৫০ মিনিট হালকা ব্যায়াম অথবা ৭৫ মিনিট ভারী ব্যায়াম করা উচিত।
আপনি করতে উপভোগ করেন এমন বিষয় বেছে নিন। আপনি হয়তো এই বিষয়গুলো করতে পারেন, যেমন বাস্কেটবল, টেনিস ও ফুটবল খেলা, জোরে হাঁটা, সাইকেল চালানো, বাগান করা, কাঠ কাটা, সাঁতার কাটা, নৌকা চালানো, জগিং করা অথবা অন্যান্য এয়ারোবিক্স করা। কোনটা হালকা ব্যায়াম অথবা কোনটা ভারী ব্যায়াম, সেটা আপনি কীভাবে নির্ধারণ করতে পারেন? সাধারণত হালকা ব্যায়াম করার সময় আপনার ঘাম হবে কিন্তু ভারী ব্যায়াম করার সময় আপনি কথা বলতে পারবেন না।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা:
শরীর সুস্থ রাখার জন্য আমাদের প্রতিদিন নিয়মিত স্নান করা উচিৎ। স্নান করার জন্য পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ জল ব্যবহার করবেন। খারাপ, পচা জল ব্যবহার করবেন না। যদি করেন তাহলে আপনার বিভিন্ন চর্ম রোগ হবে। ঠাণ্ডা, পরিষ্কার, নিরাপদ, জল ব্যবহার করবেন। যদি পারেন একটু সকাল সকাল স্নান করবেন।
সকালে স্নান করা স্বাস্থ্যের জন্য ভাল। ঠাণ্ডা জলের সাথে কিছুটা গরম জল ব্যবহার করতে পারেন। খুব বেশি সময় জলে থাকবেন না। স্নানের আগে ভাল করে সর্ষের তেল মেখে নেবেন। স্নানের সময় জীবাণু নাশক সাবান মাখুন।
আমরা প্রতিদিন যে জামা কাপড় ব্যবহার করি তা নিয়মিত পরিষ্কার করা দরকার। জামা কাপড়ের মাধ্যমে বিভিন্ন চামড়া বা ত্বকের রোগ ছড়ায়। একই পোশাক পর পর কয়েক দিন ব্যবহার করবেন না। পরের বার ব্যবহার করার আগে ধুয়ে নেবেন। না ধুলে আগের ঘাম, দুর্গন্ধ থেকে চামড়ার সমস্যা দেখা যাবে।
বেশি পুরনো জামা কাপড় ব্যবহার করবেন না। যদি পারেন ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে পুরনো জামা কাপড় বদলে ফেলুন। পুরনো কাপড় ব্যবহার করলে আপনার পুরনো চামড়ার সমস্যা ফিরে আসবে।
প্রয়োজনীয় আলো-বাতাস:
যে ঘরে সহজে আলো ও বাতাস প্রবেশ করতে পারে সে ঘরে থাকবেন। উপযুক্ত আলো স্বাস্থ্যকর, শরীরের সুস্থতার জন্য রদের দরকার। সেকারণে ছোট শিশুদের সকালের রোদে রাখা হয়। কম বা বেশি আলো দৃষ্টিশক্তি খারাপ করে দেয়।
উপযুক্ত আলো আমাদের দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখে। জীবন ধারণ ও শ্বাস গ্রহণ করার জন্য আমরা বাতাসের উপর নির্ভর করি। নির্মল ও বিশুদ্ধ বাতাস মানুষকে সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান করে। বিশুদ্ধ বায়ুতে উপযুক্ত পরিমাণ অক্সিজেন থাকে।
পর্যাপ্ত পরিমাণের ঘুম:
সুস্থ থাকার উপায় সমূহের মধ্যে ঘুম অন্যতম একটি। কার কতটা ঘুমের প্রয়োজন, সেটা ব্যক্তি-বিশেষের উপর নির্ভর করে। অধিকাংশ নবজাত শিশু দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘন্টা ঘুমায়; ১-৩ বছর বয়সি ছেলে-মেয়েরা প্রায় ১৪ ঘন্টা এবং ৩-৪ বছর বয়সি ছেলে-মেয়েরা প্রায় ১১ অথবা ১২ ঘন্টা ঘুমায়। স্কুলে যায় এমন ছেলে-মেয়েদের অন্ততপক্ষে ১০ ঘন্টা, কিশোর-কিশোরীদের প্রায় ৯ অথবা ১০ ঘন্টা এবং প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের ৭ থেকে ৮ ঘন্টা ঘুমানো প্রয়োজন।
পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশ্রাম নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কারণগুলোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানো প্রয়োজন:
- ছোটো ছেলে-মেয়ে এবং কিশোর-কিশোরীদের বৃদ্ধি ও বিকাশ।
- হরমোনের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা, যা বিপাকক্রিয়ায় ও ওজনের উপর প্রভাব ফেলে।
- হার্ট ভালো রাখা।
- রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি।
পর্যাপ্ত পরিমাণে না ঘুমালে স্থূলতা, বিষণ্ণতা, হার্টের রোগ, ডায়াবেটিস এবং বিভিন্ন দুর্ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নিশ্চিতভাবেই, এই বিষয়গুলোর জন্য আমাদের যথেষ্ট পরিমাণে বিশ্রাম নেওয়ার উত্তম কারণ রয়েছে।
তাই, আপনি যদি বুঝতে পারেন যে, আপনি পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাচ্ছেন না, তা হলে কী করতে পারেন?
- প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন।
- আপনার বেডরুমের পরিবেশ যেন নিরিবিলি, অন্ধকার ও আরামদায়ক থাকে এবং রুমের তাপমাত্রা যেন খুব বেশি বা খুব কম না হয়।
- বিছানায় শুয়ে টেলিভিশন দেখবেন না অথবা ইলেকট্রনিক গ্যাজেট ব্যবহার করবেন না।
এই পরামর্শগুলো কাজে লাগানোর পরও আপনি যদি অনিদ্রা রোগে ভোগেন অথবা আপনার ঘুমের অন্যান্য সমস্যা হয়, যেমন দিনে অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া অথবা ঘুমানোর সময় শ্বাসকষ্ট হওয়া, তা হলে আপনি উপযুক্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন।
বিনোদন:
প্রাত্যহিক জীবনে মানুষ নানা কাজে ব্যস্ততা এবং বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের কারণে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কর্মক্লান্ত মানুষের আত্মিক সজীবতার জন্য প্রয়োজন বিশ্রাম ও নির্মল বিনোদন। পরিমিত বিনোদন মানুষের সুস্থ থাকার জন্য অন্যতম একটি উপায় হতে পারে।
মানুষের শরীরের জন্য যেমন বিভিন্ন ধরনের খাদ্য ও ভিটামিন জরুরি তেমনি তার আত্মার জন্যও বিনোদন, বিশ্রাম ও খাদ্য জরুরি। আনন্দ ও চিত্ত বিনোদন মানুষের মধ্যে হতাশা ও ব্যর্থতার গ্লানিসহ অন্যান্য নেতিবাচক অনুভূতিকে মন থেকে মুছে দেয়।
আনন্দের অনুভূতি মানুষকে প্রশান্তি দেয় এবং মনকে সুস্থ ও সতেজ রাখে। আনন্দ ও চিত্ত বিনোদন মানুষকে জীবন যাপনের ক্ষেত্রে সহায়তা করে।
জীবিকার তাগিদে কিংবা সাংসারিক নানা প্রয়োজনে দিনের সিংহভাগ আমরা বিভিন্ন দৈহিক ও মানসিক কাজে ব্যস্ত থাকি। দিন শেষে যখন একটু অবসর পাই তখন অবসাদ ভুলে মানসিক প্রফুল্লতার জন্য বিনোদনের প্রয়োজনীয়তা প্রতিটি মানুষই অনুভব করি।
মানুষের জীবনে অবসরের এই সময়টুকু কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর জীবনের অনেক কিছুই নির্ভর করে। অবসরে মূলত চাই সুস্থ ধারার বিনোদন। সুস্থ ধারার বিনোদন ব্যক্তির সুষ্ঠু মানসিক বিকাশে দারুণভাবে সহায়তা করে। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বদৌলতে মানুষ নানান আধুনিক পন্থায় বিনোদনের ব্যবস্থা করে থাকে।
পরিবারের সব সদস্যের একসঙ্গে বিনোদন গ্রহণের বিষয়টি প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে পরিবারের সদস্যদের একে অন্যের কাছে আসার সুযোগ হ্রাস পাচ্ছে। তাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে।
আজকাল বাবা-মা বা পরিবারের অন্য বড় সদস্যরা ব্যস্ততার জন্য ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো খোঁজ নেন না। ফলে একটু মানসিক প্রশান্তির জন্য, বিনোদনের আশায় উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা অসৎ বন্ধু-বান্ধবের পাল্লায় পড়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে নৈতিক ও মূল্যবোধের অবক্ষয় দিন দিন বেড়েই চলেছে।
বিভিন্ন সুন্দর ও ঐতিহ্যবাহী জায়গা ভ্রমণের মাধ্যমেও সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন বিনোদন হবে, অন্যদিকে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্বন্ধেও জ্ঞানার্জন করা সম্ভবপর হবে।
শিশুদের সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করে দেয়া বড়দের দায়িত্ব। শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা করা না হলে তারা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। ফলে সে কারো সঙ্গে শান্ত ও পরিমিত ভাষায় কথাবার্তা বলতে পারে না। এতে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে যা তার মানসিক বিকাশ ও সুস্থতার পথে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে।
প্রতিযোগিতার যুগে অভিভাবকরা শিশুদের জীবনটাকে শৈশব থেকেই যুদ্ধময় করে তোলে। দিন-রাত বইয়ের চাপে তাদের অস্থির করে তোলা হয়।
শিশুদের জন্য বিনোদনের খুব কম সুযোগই তৈরি করা হয়। যার ফলে অনেক শিশু মানসিক বিকারগ্রস্ত অথবা অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। শিশুরা যে কাজগুলো করতে ভালোবাসে যেমন- ছবি অঙ্কন করা, নাচ, গান এগুলো তাদের বিনোদনের স্বার্থে স্বতঃস্ফূর্তভাবে করতে দেয়া উচিত।
তাদের ভালো লাগার পথে বাধা দিয়ে অন্য মাধ্যমের সাহায্যে বিনোদনের ব্যবস্থা করলে হিতে বিপরীত ঘটতে পারে। তবে শিশু কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের ক্ষেত্রেই বিনোদনের উৎসটি যদি অকল্যাণকর হয়ে থাকে, তাহলে সচেতন অভিভাবক হিসেবে নিশ্চয় তার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ছেলে-মেয়েদের বকাবকি না করে শান্তভাবে বন্ধু হয়ে সেসবের কুফলগুলো বুঝাতে হবে। এতে তারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে।সুষ্ঠু বিনোদনের অভাবে তরুণরা যেন ভুল পথে পা না রাখে তার বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, খেলাধুলার আয়োজন করে ছেলেমেয়েদের সঠিক মানসিক বিকাশে সহায়তা করতে হবে। বিভিন্ন পার্ক, বিনোদন কেন্দ্র তৈরি করতে হবে।
সুতরাং একজন মানুষের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন অতিবাহিত করার জন্য বিনোদনের কোনো বিকল্প নেই।
শেষকথা:
আপনার শরীর কী রকম থাকবে তার অনেকটাই নির্ভর করে আপনার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। আপনি যদি সত্যিই মনে করতে থাকেন যে আপনি ভালো নেই, তার মানে আপনি আসলেই ভালো নেই। যদি মনে করতে থাকেন আপনি চমৎকার আছেন তার মানে বুঝতে হবে আপনার শরীর স্বাস্থ্য বেশ আছে।
অন্যভাবে বলতে গেলে বলা যায় আপনার মন অনেকাংশে ঠিক করে আপনার শরীর কেমন থাকবে সেই ব্যাপারটা। কারণ এটাও সত্য যে শুধুমাত্র মনের জোরেই অনেক রোগ বা অসুখ থেকে দিব্যি সেরে উঠা যায়।
অতএব, ইতিবাচক হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলুন। আপনি মানসিক চাপের শিকার হলে আপনার শরীরও রোগের শিকার হবে। তাই সুস্থ থাকতে হলে ইতিবাচক মনোভাব তৈরী করতে হবে এবং নিজে নিজে সুস্থ থাকার বিভিন্ন উপায় সম্পর্কে ইন্টারনেটের মাধ্যমে আরও বিস্তারিত জানুন।