পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে অনেক প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের দেখা পাওয়া যায়, যার কোনোটি আছে একদম মরুঅঞ্চলে, কোনোটি পাহারের রুক্ষতায়, আবার কোনোটির দেখা পাওয়া যায় পুরোপুরি গাছপালার আচ্ছাদনে ঢাকা। কিন্তু সবথেকে বেশি রহস্যের গন্ধ পাওয়া যায় যদি বলি একটা গোটা শহর পানির নিচে। আজ এমনই একটি হারানো শহর আটলান্টিস ও বাস্তবে ডুবে যাওয়া সন্ধান পাওয়া শহরগুলো নিয়ে আলোচনা করব।
আটলান্টিস
পানির নিচে ডুবে যাওয়া শহরগুলো এর ধারণা নতুন নয়। প্লেটোর একটি গ্রন্থ ডায়ালগ টাইমাউস এন্ড ক্রিটিয়াস থেকেই প্রথম এর সম্পর্কে জানা যায়। তার মতে এই দ্বীপের অধিবাসীরা তাদের নৌ সক্ষমতা দিয়ে ইউরোপের অধিকাংশ স্থান দখল করে নেয়। এরপর এথেন্স জয় করার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালানোর পর প্রায় একদিন একরাতের মধ্যে এই দ্বীপ পানির নিচে তলিয়ে যায়।
তবে প্লেটোর বর্ণনার আটলান্টিস শহরটির পৃথিবীর কোথাও এখনো খুঁজে পাওয়া যায় নি। এই দ্বীপটির কথা একমাত্র পাওয়া যায় প্লেটোর এই গ্রন্থে, আর কোথাও এর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। প্লেটোর তথ্য অনুযায়ী খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে এথেন্সের বিখ্যাত নীতিনির্ধারক সেলোনের কাছ থেকে তিনি এবিষয়ে জানতে পেরেছিলেন, পরে সেটাই তিনি গল্প আকারে লিপিবদ্ধ করেন।
আন্ডার গ্রাউন্ড সিটি অফ কিউবা
সত্যিই আটলান্টিস দ্বীপ ছিল কিনা তার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমান এখনো পাওয়া যায় না। কিন্তু পৃ্থিবীর বিভিন্ন স্থানে পানির নিচে এমন বেশ কিছু স্থাপনা পাওয়া যায়, যার কিছু স্পষ্টতই মানবসৃষ্ট এবং কিছু আছে যা প্রাকৃ্তিক না কৃ্ত্রিম তা এখনো নিশ্চিত করা যায় নি। অনেকেই ধারনা করেন যে এগুলো সেই হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন আটলান্টিস। এমনই ডুবে যাওয়া শহরগুলো এর মধ্যে অন্যতম একটি হলো আন্ডার গ্রাউন্ড সিটি অব কিউবা।
পশ্চিম কিউবার কাছেই সমুদ্রের ২,০০০ ফুট নিচে অবস্থিত এই শহর। ২০০১ সালে কিউবার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত সমুদ্রের তলদেশে জরিপ চালানোর সময় প্রথম এই শহরের ধ্বংসাবশেষ মানুষের নজরে আসে। বিশেষজ্ঞরা এখানে অনুসন্ধান করে পিরামিড আকৃতির স্থাপনা, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট প্রভৃতি খুজে পেয়েছেন। অনেকের ধারনে মতে এটি কোনো ছোটখাটো শহর নয়, বরং এটিকে কেন্দ্র করেই হয়তো এক্ সময় ছিল একটি ভিন্ন সভ্যতা। গবেষকদের মতে ভূপৃষ্ঠের ওপরে এই সভ্যতা গড়ে উঠলেও বিভিন্ন প্রাকৃ্তিক কারনে এই শহর ধীরে ধীরে সমুদ্র তলে ডুবে যেতে থাকে। তবে কিভাবে এতকাল আগে এত উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠেছিল নাকি এটি প্লেটোর বর্ণিত সেই আটলান্টিস, তা আজও এক রহস্য।
পাভলোপেত্রি
গ্রিসের পেলোপনেশিয়ার দক্ষিণ ল্যাকোনিয়ায় পানির নিচে ১৯০৪ সালে প্রথম এই শহরটি আবিষ্কৃত হয়। পানির নিচে ডুবে যাওয়া শহরগুলো এর মধ্যে সব থেকে পুরনো শহরের খেতাব দেওয়া হয় এটিকেই। ধারণা করা হয় এই শহরটি হয়তো ব্রোঞ্জ যুগে গড়ে উঠেছিল। প্রায় একহাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সংগঠিত তিনটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের প্রকোপে এই শহরটি একেবারে ডুবে যায়। এই শহরে ছিল উন্নতমানের রাস্তাঘাট, ভবন, উপাসনালয়। ব্যবসা, কৃ্ষি, কাপড় বোনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে এরা যথেষ্ট উন্নতি করেছিল।
পাভলোপেত্রির এই ডুবন্ত শহরের প্রকৃ্ত নাম কি ছিল বা এই শহরই কি আসলে আটলান্টিস ছিল কিনা তা এখনো কেউ বলতে পারেননি। তবে এই সুন্দর প্রাচীন সভ্যতাকে বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে সম্মান প্রদান করেছে ইউনেস্কোও।
দ্যা ইয়ানাগুনি মনুমেন্ট
এটি জাপানের সমুদ্রতীরের ইয়োনাগুনি নামক অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে সমুদ্রের নিচে ডুবে রয়েছে অদ্ভুত সব আকৃতির স্থাপনা বা পাথর, যেগুলি আসলে মানুষের তৈরি নাকি প্রাকৃ্তিক ভাবেই তৈ্রি হয়েছে তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো দুভাগে বিভক্ত। অনেকের পর্যবেক্ষন মতে এখানকার স্থাপনাগুলোর আকৃ্তির সাথে এর উপকূ্লের প্রাচীন স্থাপনাগুলোর আকৃ্তিগত বিশেষ মিল পাওয়া যায়।
আরও পড়ুনঃ
দেজা ভ্যু: অচেনাকে চেনার এক অদ্ভুত অনুভূতি
অ্যাম্বার রুম: এক চোখ ধাঁধানো ঐশ্বর্যমন্ডিত কক্ষ হারিয়ে যাবার ইতিহাস
তাদের ধারণা এগুলো সব একই সভ্যতার অংশ। পানির নিচে এই ক্ষয়ে যাওয়া পাথর গুলো দেখে বিস্মিত হতে হয় এর নিখুঁত সিঁড়ির মত গঠনের কারনে। বেশিরভাগ ধাপগুলোর কোনাই একেবারে সমকোনে কাটা। যা দেখে যে কারো মনে হবে এটি মানুষেরই হাতে গড়া কোনো স্থাপনা।
কিন্তু ভূতত্ত্ববিদেরা মনে করেন এটি ওই অঞ্চলের মাটির প্রকৃ্তির কারনে হয়েছে। তাদের মতে ওই অঞ্চল মূলত বেলে পাথরে গঠিত যা ওই অংশের প্রচন্ড পানির প্রবাহের ফলে ক্ষয় প্রাপ্ত হয়ে এমন নিখুঁত আকার ধারন করেছে।
গালফ অফ ক্যাম্বে
২০০০ সালে ভারতের বর্তমান দ্বারকার কাছে পানির প্রায় ১৩১ফুট নিচে এই প্রাচীন নগরের অবস্থান পাওয়া যায়। এই স্থাপনার মাঝে দেখা যায় অদ্ভুত জ্যামিতিক কারুকাজ। এর আনুমানিক বয়স খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫০০ সাল পর্যন্ত হতে পারে। সময়কাল এবং প্রাচীন নগর দ্বারকার সাথে এর অবস্থানগত সামঞ্জস্য থাকার কারনে অনেক বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদেরা একে সমৃদ্ধশালী নগরী দ্বারকা হিসেবেই চিহ্নিত করেন।
বিমিনি রোড
বাহামা দ্বীপপুঞ্জের কাছে সমুদ্রের প্রায় ১৮ফুট গভীরে অবস্থিত এক রহস্যময় রাস্তার নাম বিমিনি রোড। এটি ফ্লোরিডার মায়ামি সমুদ্রতল থেকে প্রায় পঞ্চাশ মাইল দূরে অবস্থিত। এটি লাইমস্টোন এর দুটো করে ১০ বর্গফুট আকৃতির বিশাল পাথরকে নির্ভুলভাবে খোদাই করে বানানো হয়, যা প্রায় আধামাইল যাওয়ার পর একটি বাক নিয়ে নেয়। এটি কোনো শহরের সাথে সংযোগ সড়ক বা কোনো শহরের মূল প্রাচীরের অংশ বলে মনে করা হয়।
কিছু ভূতত্ত্ববীদ দাবী করেছিলেন যে পাথরের এই আকৃতির জন্য ঐ অঞ্চলের সমুদ্রের স্রোত দায়ী। কিন্তু কিছু বিজ্ঞানী এ পাথরগুলি পরীক্ষা করে এগুলো অস্ত্রের সাহায্যে কাটা তার প্রমাণ পেয়েছেন। তাছাড়া এর আশেপাশের অন্যান্য প্রাকৃতিক পাথরগুলির সাথে এর পার্থক্যও স্পষ্ট। যা একে আরো অনন্য করে তোলে।
সিটি অব লায়ন
চীনে একটি অতি সুন্দর শহর ছিল সিটি অব লায়ন। শহরটি প্রায় ১৩০০ বছর আগে হান সম্রাটদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৫৯ সালে চীন সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একটি লেক তৈরি করে। এর জন্য পাহাড়ে উপতক্যাগুলো ভরাট করে বাঁধ দেওয়া হয়। তাতে পানির নিচে তালিয়ে যায় এই পুরো শহরটি। পানির প্রায় ১৩০ ফুট নিচে ডুবে রয়েছে এই শহরটি। এখনো প্রায় অক্ষত রয়েছে এই শহরটি। অনেকেই ডাইভিং কস্টিউমে এই শহর দেখতে যান। টুরিস্ট স্পট হিসেবে এখন এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ক্লিওপেট্রার প্রাসাদ
প্রাচীন মিশরের বিখ্যাত নারী, অসীম রূপবতী ক্লিওপেট্রার কথা সবার জানা। কিন্তু তার প্রাসাদের বিষয়ে অনেকেই জানেন না। প্রাচীন মিশরের অনেক পিরামিড ও স্থাপনাই মাটির ওপর বা মরুভূমিতে পাওয়া যায়, কিন্তু ক্লিওপেট্রার প্রাসাদটি ও ডুবে যাওয়া শহরগুলো আছে ভূমধ্যসাগরের জলে।
১৯৯১ সালের ২৩ জানুয়ারি ভূমধ্যসাগরের গভীরে আবিষ্কার হয় এই প্রাসাদ। পরে কার্বন ডেটিং করে দেখা যায় এই প্রাসাদ ক্লিওপেট্রার জন্মের প্রায় ৩০০ বছর আগে তৈ্রি। পানির নিচের এই নগরী থেকে পরে পাওয়া যায় মিশরীয় দেবী আইরিসের মূর্তি, ক্লিওপেট্রার পারিবারিক সদস্যদের মূর্তি, অনেক অলংকার, বাসনপত্র, স্ফিংসের মাথাসহ আরো অনেক কিছু। তবু কিছু সীমাবদ্ধতা থাকার কারনে অনেক কিছুই উদ্ধার করা যায় নি।
হেরাক্লিয়ন
মিশরে ডুবে যাওয়া শহরগুলো এর মধ্যে আরো একটি শহর হেরাক্লিয়ন। ২০০১ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদেরা নেপোলিয়নের একটি রণ তরী সন্ধান করতে গিয়ে খুঁজে পান এই শহর।
এই নগরী সম্পর্কে অনেক ইতিহাসবিদই লিখে গেছেন। তাদের মতে এই নগরী এক সময় ভূমধ্যসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগর ছিল। এখানে পাওয়া যায় মিশরের বিভিন্ন দেবদেবীর প্রায় অক্ষত মূর্তি। পাওয়া যায় অনেক ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র ও উপাসনালয়ের ধ্বংসাবশেষ। তবে সাগরতলে প্রচুর পলি জমে যাওয়ার কারনে এই নিদর্শন গুলোর বেশির ভাগই তুলে আনা সম্ভব হয় নি।
পৃথিবী জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে নানা রকম আকর্ষণীয় নিদর্শনসমুহ। এর অনেকগুলোর ইতিহাস আমাদের জানা, আবার অনেকগুলি অজানা। আমাদের সুন্দরবন অঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অংশেও পাওয়া গেছে এমনই কিছু স্থাপনা। বিশেষজ্ঞদের মতে এটি হয়তো ছিল কোনো বন্দর বা লবণ তৈরির কারখানা। এ থেকে আমরা এই বাংলার এক সমৃদ্ধ অতীত সম্পর্কে জানতে পারি। আসলে পানির নিচে ডুবে যাওয়া শহরগুলো হয়তো পৃ্থিবীর ইতিহাসের কোনো অজানা অধ্যায়।
ছবিঃ সংগৃহীত
তথ্যসূত্রঃ অনলাইন মিডিয়া