পৃথিবীর ফুসফুস বলে পরিচিত বৃহৎ বনাঞ্চল আমাজন। নানান রূপবৈচিত্রে সমৃদ্ধ এই বনভূমি। হাজারো প্রজাতির গাছপালা ও পশুপাখিতে পরিপূর্ণ এই রেইনফরেস্ট। কেবল প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যই নয়, এখানে দীর্ঘদিন যাবত বাস করছে নানান বর্ণের ও নানান ঐতিহ্যের ধারক আমাজন আধিবাসীরা। তারা ‘আমাজনিয়ান’ তথা আমাজনের অধিবাসী বলে পরিচিত । আধুনিক জীবনের আঁচ লেগে তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য আজ সংকটের মুখে; সংকটাপন্ন তাদের অস্তিত্বও।
আমাজনের অধিবাসী:
ধারণা করা হয় আমাজনের মূল ভূমি এবং এর আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে প্রায় ৪০০ এরও বেশি গোত্রের অধিবাসী রয়েছে। নৃতাত্ত্বিকদের মতে, এসকল অঞ্চলে বিভিন্ন গোত্রের অধিবাসীরা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে প্রায় ৩২০০০ থেকে ৩৯০০০ বছর আগে।
উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গোত্রের মধ্যে রয়েছে ইয়ানোমামি, কায়াপো, ব্রাজিলিয়ান ইন্ডিয়ান, নুকাক, কাওয়াহিভা ব্রাজিলসহ আরও অনেক গোত্র। প্রতিটি গোত্রের অধিবাসীদের রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য, আচার-আচরণ ও ভাষা।
এসব গোত্রের মধ্যে বেশ কয়েকটি গোত্রের অধিবাসীরা প্রায় ৫০০ বছর ধরে বহিরাগতদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। তবে এখনও কিছু গোত্র রয়েছে যারা বাইরের জগত থেকে নিজেদেরকে সম্পূর্ণ আলাদা রেখেছে। এদেরকে বলা হয় Uncontacted Tribes . ধারণা করা হয় আমাজনে বর্তমানে এধরনের ৭০টি গোত্র রয়েছে ।
ইয়ানোমামি গোত্রের অধিবাসীদের জীবনযাত্রাঃ
আমাজনের অধিবাসীদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গোত্র হল ইয়ানোমামি। এদেরকে ইয়ানোমামা বা ইয়ানোমামো নামেও ডাকা হয়। এ গোত্রে প্রায় ৩৫,০০০ মানুষ রয়েছে।
ভেনেজুয়েলা এবং ব্রাজিলের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি গ্রামে তাদের বসবাস। ছোট ছোট এসকল গ্রামে ৫০ থেকে ৪০০ জন করে অধিবাসী বাস করে।
প্রতিটি গ্রাম একটি সাধারণ ছাদ দ্বারা বেষ্টিত থাকে এবং এর ভিতরে প্রতিটি পরিবারের আলাদা আলাদা ঘর থাকে। এগুলোকে একত্রে শাবানো বলা হয়। ডিম্বাকৃতির এসকল শাবানোগুলোর সামনে থাকে উঠোন যা প্রায় ৯১ মিটার করে হয়।
এই ছাদ মূলত বন থেকে সংগৃহীত গাছের ডাল ও লতাপাতা দিয়ে তৈরি। যার কারণে প্রাকৃতিক দূর্যোগে এসব ছাদ টিকতে পারেনা। প্রতি ৪ থেকে ৬ বছরে নতুন করে শাবানো বানানো হয়।
ইয়ানোমামি গোত্রের অধিবাসীরা প্রচুর পরিমাণে কলার চাষ করে থাকে। এছাড়াও আখ, আম, মিষ্টি আলু, পেঁপে, পেয়ারা ও অন্যান্য আরও শস্যের ফলন উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন পশু শিকার এবং মাছ ধরেও তারা খাদ্যের চাহিদা পূরণ করে থাকে।
মহিলারা সাধারণত ঘরের কাজকর্ম এবং বাচ্চাদের দেখাশোনা করে। এছাড়াও বাড়ির কাছে বাগান করে বিভিন্ন ফলের চাষ করে থাকে। তারা কখনো কখনো ব্যাঙ ও কাঁকড়া শিকার করে। পুরুষেরা সাধারণত দূরে পশু শিকার ও মাছ ধরার জন্য যায়।
ইয়ানোমামি গোত্রের রয়েছে নিজস্ব ভাষা। প্রধানত চারটি ভাষায় তারা মনের ভাব প্রকাশ করে। নিনাম, সানুমা, ওয়াইকা ও ইয়ানোমামো তাদের প্রধান ভাষা। তবে আরও কিছু আঞ্চলিক ভাষায়ও তারা কথা বলে থাকে ।
আরও পড়ুনঃ
“মহাবন আমাজন” জঙ্গলের জানা অজানা তথ্য
সাজেক ভ্যালি: লাল পাহাড়ের দেশে প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য
পাঁচটি ‘বিষাক্ত ফুল’ যা হতে পারে মৃত্যুর কারণ
তারা নিজস্ব ঐতিহ্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। তাদের মাঝে আধ্যাত্মিক দিকে একধরনের ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়। মৃত্যু পরবর্তী জীবন ও জগতের প্রতি তাদের উৎসাহ লক্ষ্য করা যায় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে।
তাদের ধারণা, মৃত্যুর পরের জগতের কাছাকাছি যেতে হলে প্রচুর বৃক্ষের প্রয়োজন। ধর্মীয় গুরুকে তারা শামান বলে। একজন শামান বিভিন্ন গাছপালা ও পশুপাখি সম্পর্কে অনেক জ্ঞান ধারণ করেন। তাদের বিশ্বাস, শামান আত্মার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। এছাড়াও বিভিন্ন উৎসব পালিত হয় এ গোত্রে।
ফসল ভালো হলে তারা বিশাল ভোজের আয়োজন করে যাতে আশেপাশের গ্রামবাসীকে নিমন্ত্রণ করা হয়। সকলে পাখির পালক ও নানা ফুলে নিজেদেরকে সজ্জিত করে এসব আচার অনুষ্ঠান পালন করে।
কায়াপো গোত্রের অধিবাসীদের জীবনযাত্রাঃ
আমাজনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য গোত্র কায়াপো। পর্তুগীজ শব্দ canape থেকে কায়াপো শব্দটি এসেছে। এই গোত্রের অধিবাসীরা আমাজন নদীর দক্ষিণ দিক ও জিঙ্গু নদীর তীর ঘেঁষে বাস করে। তাদের গোত্রকে এজন্য অনেক সময় জিঙ্গু গোত্র বলেও ডাকা হয়।
২০১০ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ গোত্রের মোট জনসংখ্যা ৮৬৩৮ জন। সাধারণত কায়াপো নামে তাদেরকে অন্যান্য গোত্রগুলোর মানুষ ডেকে থাকে, যার অর্থ বানরের মত দেখতে। কারণ এ গোত্রের মানুষেরা বানরের চেহারার মত দেখতে মুখোশ পরে থাকে। বহিরাগতদেরকে তারা Poanjos বলে থাকে।
তাদের প্রধান খাদ্য মিষ্টি আলু। এছাড়াও বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করে তারা। একটি জমিতে একটানা কয়েক বছর চাষ করার পর নতুন কোন জমিতে চাষাবাদ শুরু করে।
পুরনো জমিতে তখন বিভিন্ন ঔষধি গাছ লাগানো হয়। তারা প্রায় ৬৫০ প্রজাতির ঔষধি গাছের চাষ করে। এছাড়াও গোপনে কিছু জমিতে কেউ কেউ চাষাবাদ করে যা War Garden নামে পরিচিত। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে খাদ্যঘাটতি মোকাবেলায় এসব জমিতে ফসল ফলানো হয়।
এ অধিবাসীদেরও রয়েছে নিজস্ব ভাষা। তাদের ভাষার নাম কায়াপো ভাষা। অন্যান্য কয়েকটি আঞ্চলিক ভাষায়ও তারা মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে। নিজেদের শরীরকে কালো রঙে আবৃত রাখা তাদের একটি আচারের মধ্যে পরে। এ কালো রঙ গভীর বনে শিকারের সময় তাদের জন্য অনুকূল হয়।
কায়াপো গোত্রের মানুষদেরও রয়েছে নিজস্ব কিছু আচার অনুষ্ঠান। পৃথিবীর সাথে মানুষের সম্পর্ককে তারা খুব গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে থাকে। এ গোত্রের অধিবাসীদের কাছে সৌন্দর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষের সুন্দর নাম তাদের কাছে সমৃদ্ধির প্রতীক। বিভিন্ন উৎসব পালনেও তারা স্বতন্ত্র।
বিভিন্ন সংকটের মুখে আমাজনের অধিবাসী:
আধুনিক জীবনের সাথে তাল না মেলানোয় বিভিন্নভাবে সংকটের মুখে আমাজনের বিচিত্র রীতিনীতির এসকল অধিবাসীরা। বিগত কয়েকবছরে ইউরোপিয়ান বেশ কয়েকটি কলোনির আবির্ভাব আমাজনের অধিবাসীদের জীবনে বেশ প্রভাব বিস্তার করছে। তারা হারাচ্ছে নিজেদের হাজার বছরের ভূমি ও ঐতিহ্য। যোগাযোগের বিপ্লবে পৃথিবীর নানান প্রান্তের মানুষ তাদের কাছাকাছি এসে তাদের ঐতিহ্যের ভীত নাড়িয়ে দিয়েছে।
এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে এখানকার অধিবাসীরা। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সালে ম্যালেরিয়া, অপুষ্টি এবং মার্কারির বিষক্রিয়ায় ইয়ানোমামি গোত্রের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
তাদের ভূমি থেকে স্বর্ণ উত্তোলনের জন্য বহিরাগতদের সরকারি ভাবে অনুমতি দেয়া হয়। ৩ বছর ব্যাপ্তিকালের সেই ঘোষণার ফলশ্রুতিতে বহিরাগতদের সাথে এ গোত্রের অধিবাসীদের সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। এতে অনেক অধিবাসীর মারা যাওয়ার কথা শোনা যায়।
যদিও ব্রাজিলের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন। নৃতাত্ত্বিক Rita Ramos এই ঘটনাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “এ ঘটনা ব্রাজিলকে গণহত্যার জন্য অভিযুক্ত করার দিকে নিয়ে গিয়েছে”।
এছাড়াও ১৯৯৩ সালের Haximu Massacre আরেকটি জঘন্য ঘটনা যাতে ১৬ জন ইয়ানোমামি অধিবাসী মারা গিয়েছিল। কিছু অধিবাসী দাবি করেছিলেন যে ২০১২ সালে একটি হেলিকপ্টার থেকে তাদের উপর হামলা করা হয়েছিল যাতে ৮০ জন অধিবাসী মারা গিয়েছিল। যদিও এ ঘটনার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি।
বর্তমান বিশ্বের আধুনিক মানুষেরা তাদের নিজেদের আরাম আয়েসের জন্য নানাভাবে বনভূমির ক্ষতি করছে। বনভূমি উজার ও সমুদ্রের বর্জ্য আমাজনের এসব অধিবাসীর জীবনেও প্রভাব বিস্তার করছে। এতে করে বিঘ্নিত হচ্ছে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সরকারিভাবে তারা অনেকেই প্রতিরক্ষার আওতায় নেই। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন বড় বড় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও জমির দখলদারির ঝুঁকি।
এমনকি বর্তমানে চলমান কোভিড-১৯ এর ঝুঁকিতেও রয়েছে এসকল অঞ্চলের অধিবাসীরা। এবছরের এপ্রিলে ১৫ বছরের এক ইয়ানোমামি অধিবাসীর কোভিড -১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার কথা জানা যায়।
আমাজনের অধিবাসী এই বৃহৎ রেইনফরেস্টের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। হাজার বছর ধরে এই বনাঞ্চলে এসকল অধিবাসীরা বাস করে আসছে। এখানকার পরিবেশ ও প্রকৃতির সাথে মিশে গেছে তাদের অস্তিত্ব । আমাজনের বাস্তুসংস্থান ঠিক রাখতে আমাজনের অধিবাসী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখানকার ভারসাম্য বজায়ে তাদের গুরুত্ব অনেক। তারা আমাদের চাইতে অনেক বেশি জানে এই দীর্ঘ বনাঞ্চল সম্পর্কে। প্রশাসনের উচিত তাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য যাতে বিঘ্নিত না হয় তার জন্য সচেষ্ট হওয়া।
ছবিঃ সংগৃহীত